টমেটো, বেগুন কিংবা তরমুজের চারা কলম (Grafting) করার জন্য গ্রাফটিং ক্লিপস হলো ছোট কিন্তু অত্যন্ত কার্যকারী টুলস। এক সময় আমরা সুতলি বা পলিথিন দিয়ে পেঁচিয়ে গাছের ডাল বা চারার কলম করতাম।
সেই পদ্ধতিতে সময় যেমন বেশি লাগত, তেমনি কলম বাঁচার হারও ছিল কম। একটু নড়াচড়া হলেই জোড়া খুলে যেত বা চারা মরে যেত।
কিন্তু আধুনিক কৃষিতে প্রযুক্তি এখন কৃষকের বা হাত আর সময়ের দাম—দুটোই বাড়িয়ে দিয়েছে। দিন বদলেছে। এখন নার্সারি মালিক এবং স্মার্ট কৃষকদের হাতে উঠে এসেছে এক জাদুকরী ছোট যন্ত্র—‘গ্রাফটিং ক্লিপ’ (Grafting Clip)।
বিশেষ করে সবজি ও লতানো ফসলের জোড় কলম করার ক্ষেত্রে এটি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
আজকের ব্লগে আমরা —গ্রাফটিং ক্লিপ আসলে কী, এর সুবিধা-অসুবিধা, কেন এটি সনাতন পদ্ধতির চেয়ে সেরা এবং এটি ব্যবহারের সঠিক নিয়মাবলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
গ্রাফটিং ক্লিপ কী?
সহজ কথায় বললে গ্রাফটিং ক্লিপ হলো উন্নতমানের প্লাস্টিক (সাধারণত PE বা পলিইথিলিন) দিয়ে তৈরি এক ধরণের ছোট ক্লিপ বা চিমটা।
এটি মূলত দুটি ভিন্ন চারা—রুটস্টক (যে গাছটির শেকড় থাকবে) এবং সায়ন (যে গাছটির ফলন আমরা চাই)—এর কাটা অংশকে জোড়া লাগিয়ে আটকে রাখতে ব্যবহার করা হয় থাকে।
এটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যা চারার নরম কান্ডকে আঘাত না করেই এটি শক্তভাবে ধরে রাখতে পারে, যাতে টিস্যুগুলো দ্রুত জোড়া লাগতে পারে।
কেন গ্রাফটিং ক্লিপ ব্যবহার করা উচিত? (বিস্তারিত কারণ)
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, “সুতলি বা পলিথিন দিয়েই তো কাজ চালানো যায়, তাহলে টাকা খরচ করে ক্লিপ কেন কিনব?” এর উত্তর লুকিয়ে আছে দক্ষতা, সময় এবং সফলতার হারের মধ্যে।
১. কাজের গতি ও শ্রম সাশ্রয়
সনাতন পদ্ধতি সময়সাপেক্ষ; যাতে একজন শ্রমিককে পলিথিন কেটে সাইজ করতে হয়, তারপর খুব সাবধানে চারার জোড়াটি বাঁধতে হয় এবং শেষে গিট দিতে হয়।
কিন্তু গ্রাফটিং ক্লিপ ব্যবহার করলে—কাটো, জোড়া লাগাও এবং ক্লিপটি পরিয়ে দাও; কাজ শেষ!
এতে কাজের গতি ৩ থেকে ৪ গুণ বেড়ে যায়। একজন শ্রমিক দিনে যে পরিমাণ কলম বাঁধতে পারতেন, ক্লিপ ব্যবহার করে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কাজ করতে পারেন। এতে লেবার খরচ বা শ্রমিক মজুরি অনেক কমে আসে।
২. চারার বাঁচার হার বৃদ্ধি (High Survival Rate)
কলম সফল হওয়ার প্রধান শর্ত হলো রুটস্টক এবং সায়নের কাটা অংশের ‘ক্যাম্বিয়াম লেয়ার’ বা টিস্যু সঠিকভাবে মিশে যাওয়া।
সুতলি দিয়ে বাঁধলে অনেক সময় চাপ কম-বেশি হয়। চাপ বেশি হলে কান্ড থেঁতলে যায়, আর কম হলে ফাঁকা থেকে যায়।
কিন্তু গ্রাফটিং ক্লিপ একটি নির্দিষ্ট ও সমান চাপ (Constant Pressure) বজায় রাখে। এটি নড়াচড়া বা বাতাসের আঘাতে জোড়া নড়তে দেয় না। ফলে টিস্যু দ্রুত জোড়া লাগে এবং চারা মারা যাওয়ার ঝুঁকি প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
৩. নমনীয় ও নিরাপদ উপাদান
FarmsFy এর গ্রাফটিং ক্লিপ গুলো উন্নতমানের PE (পলিইথিলিন) প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি। এটি যথেষ্ট নরম ও নমনীয়। কচি টমেটো বা বেগুনের চারার কান্ড খুবই নরম হয়।
শক্ত কিছু দিয়ে বাঁধলে সেখানে ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং ফাঙ্গাস আক্রমণ করে। কিন্তু এই ক্লিপগুলো চারার কোনো ক্ষতি না করেই কাজ সম্পন্ন করে।
৪. নতুন প্রজন্মের স্মার্ট ডিজাইন
এই ‘নিউ জেনারেশন’ গ্রাফটিং ক্লিপগুলো ফিক্সড সাইজের নয়। এগুলো ২.২ থেকে ৪.৫ মি.মি. পর্যন্ত চারার ব্যাস অনুযায়ী অটোমেটিক অ্যাডজাস্ট হতে পারে। অর্থাৎ, চারা একটু মোটা বা চিকন হলেও ক্লিপটি সুন্দরভাবে সেট হয়ে যায়।
গ্রাফটিং ক্লিপের সুবিধা ও অসুবিধা
যেকোনো প্রযুক্তিরই দুটি দিক থাকে। ব্যবহারের আগে গ্রাফটিং ক্লিপ সুবিধা ও অসুবিধাগুলো জেনে নেওয়া জরুরি।
সুবিধা (Pros):
- সময় বাঁচায়: চোখের পলকে কলম করা সম্ভব।
- দক্ষতা বাড়ায়: অদক্ষ শ্রমিকও খুব সহজে এটি ব্যবহার করতে পারেন।
- পুনরায় ব্যবহারযোগ্য: সঠিক যত্ন নিলে এবং জীবাণুমুক্ত করলে এক ক্লিপ একাধিকবার ব্যবহার করা যায় (যদিও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে একবার ব্যবহারই শ্রেয়)।
- গাছের বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে: ক্লিপটি নমনীয় হওয়ায় জোড়া লাগার সময় গাছ মোটা হলে এটি কিছুটা প্রসারিত হয়, ফলে গাছের বৃদ্ধিতে বাধা দেয় না।
- সহজ অপসারণ: জোড়া লেগে যাওয়ার পর ক্লিপটি খুলে ফেলা খুব সহজ, যা সুতলি খোলার চেয়ে অনেক কম ঝামেলাপূর্ণ।
অসুবিধা (Cons):
- প্রাথমিক খরচ: সুতলির চেয়ে এর দাম কিছুটা বেশি, তাই শুরুতে বিনিয়োগ করতে হয়।
- সাইজ সমস্যা: চারার কান্ড খুব বেশি চিকন বা খুব বেশি মোটা হলে সঠিক সাইজের ক্লিপ না পেলে কাজ করা কঠিন হতে পারে।
- পরিবেশগত দিক: যেহেতু এটি প্লাস্টিক, তাই জমিতে ফেলে রাখলে মাটি দূষণ হতে পারে। কাজ শেষে এগুলো সংগ্রহ করে রাখা উচিত।
ব্যবহারের ক্ষেত্র: কোথায় কোথায় ব্যবহার করবেন?
গ্রাফটিং ক্লিপ মূলত নরম কান্ডের চারাগুলোর জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এর প্রধান ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো হলো:
১. সবজি জাতীয় ফসল:
- টমেটো (বিশেষ করে জংলি বেগুনের সাথে টমেটোর গ্রাফটিংয়ে)।
- বেগুন।
- মরিচ ও ক্যাপসিকাম।
২. লতানো ফসল:
- তরমুজ (কুমড়ার রুটস্টকের সাথে তরমুজের সায়ন)।
- শসা।
- মিষ্টি কুমড়া ও স্কোয়াশ।
৩. ফুল ও অন্যান্য:
- বিভিন্ন ধরণের নরম কান্ডের ফুলের চারার জোড় কলম।
- গাছকে খুঁটির সাথে সোজা করে রাখতে (সাপোর্ট ক্লিপ হিসেবে)।
সঠিক সাইজ নির্বাচনের গাইডলাইন
এই সময়ে বাজারে বিভিন্ন মাপের ক্লিপ পাওয়া যায়। আপনার চারার বয়সের ওপর ভিত্তি করে সঠিক ক্লিপ বেছে নেওয়া খুব জরুরি। নিচে একটি গাইডলাইন দেওয়া হলো:
| চারার ধরন ও অবস্থা | কান্ডের ব্যাস (Diameter) | প্রস্তাবিত ক্লিপ সাইজ |
| খুব ছোট বা কচি চারা | ২.০ – ২.৫ মি.মি. | ছোট সাইজ (Small) |
| মাঝারি চারা (বেগুন, টমেটো, মরিচ) | ৩.০ – ৪.০ মি.মি. | মাঝারি সাইজ (Medium) |
| মোটা কান্ডের চারা (তরমুজ, কুমড়া, লাউ) | ৪.৫ – ৫.০ মি.মি. বা তার বেশি | বড় সাইজ (Large) |
টিপস: নতুন প্রজন্মের ক্লিপ কিনলে ২.২ থেকে ৪.৫ মিমি পর্যন্ত চিন্তামুক্ত থাকা যায়।
গ্রাফটিং ক্লিপ ব্যবহারের সঠিক নিয়ম (ধাপে ধাপে)
সঠিক পদ্ধতি না জানলে সেরা ক্লিপ দিয়েও ভালো ফল পাওয়া যাবে না। নিচে ব্যবহারের বিস্তারিত নিয়ম দেওয়া হলো:
ধাপ-১: প্রস্তুতি ও জীবাণুমুক্তকরণ
কলম করার আগে আপনার কাটার (ব্লেড বা চাকু) এবং ক্লিপগুলো জীবাণুমুক্ত করে নিন। অ্যালকোহল বা জীবাণুনাশক পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়া ভালো। রুটস্টক এবং সায়ন চারাগুলোকে আগে থেকেই পানি দিয়ে সতেজ রাখুন।
ধাপ-২: কাটিং (Cutting)
- প্রথমে রুটস্টক বা যে গাছটির শেকড় থাকবে, তার ওপরের অংশটি মাটি থেকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় ৪৫ ডিগ্রি কোণ করে (তেরছাভাবে) কেটে ফেলুন।
- একইভাবে সায়ন বা যে জাতটি আপনি লাগাতে চান, তার কান্ডটিও একই মাপে ৪৫ ডিগ্রি কোণে কাটুন।
- খেয়াল রাখবেন, কাটার সময় যেন কান্ড থেঁতলে না যায়। এক টানে কাটার চেষ্টা করুন।
ধাপ-৩: জোড়া লাগানো (Joining)
- এবার রুটস্টকের কাটা অংশের ওপর সায়নের কাটা অংশটি বসান।
- লক্ষ্য রাখবেন যেন দুটির কাটা তল হুবহু মিলে যায়। কোনো ফাঁক থাকা যাবে না।
ধাপ-৪: ক্লিপ লাগানো (Clipping)
- জোড়াটি এক হাত দিয়ে ধরে রাখুন।
- অন্য হাতে গ্রাফটিং ক্লিপটির পেছনের অংশে চাপ দিয়ে মুখটি ফাঁকা করুন।
- এবার আলতো করে জোড়া লাগানো অংশের ঠিক মাঝখানে ক্লিপটি পরিয়ে দিন।
- খেয়াল করুন ক্লিপটি যেন জোড়ার অর্ধেক রুটস্টক এবং অর্ধেক সায়নকে কামড়ে ধরে থাকে।
ধাপ-৫: পরবর্তী যত্ন (Aftercare)
ক্লিপ লাগানোর পর চারাগুলোকে একটি ‘হিলিং চেম্বার’ বা ছায়াযুক্ত, আর্দ্র স্থানে ৩-৭ দিন রাখতে হয়। এটি কলম জোড়া লাগার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। ৭-১০ দিন পর জোড়া লেগে গেলে এবং নতুন পাতা ছাড়তে শুরু করলে ধীরে ধীরে রোদে অভ্যস্ত করতে হয়। গাছ পুরোপুরি সতেজ হলে ক্লিপটি খুলে ফেলুন বা গাছ বড় হওয়ার সাথে সাথে এটি নিজে থেকেও পড়ে যেতে পারে (যদি বায়োডিগ্রেডেবল হয়, তবে প্লাস্টিক হলে খুলে ফেলাই ভালো)।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: এই ক্লিপগুলো কি বারবার ব্যবহার করা যায়?
উত্তর: যেহেতু এগুলো উন্নতমানের প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি, তাই সাবধানে খুলে রাখলে জীবাণুমুক্ত করে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব। তবে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সাধারণত একবার ব্যবহার করাই নিরাপদ।
প্রশ্ন: নতুন প্রজন্মের ক্লিপ আর পুরানো স্টাইলের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: পুরানো স্টাইলের ক্লিপগুলো নির্দিষ্ট মাপের (২-৫ মিমি) হতো। কিন্তু নতুন প্রজন্মের স্পেশাল ক্লিপগুলো (২.২-৪.৫ মিমি) চারার কান্ডের সাথে নিজে থেকেই অ্যাডজাস্ট হতে পারে, যা অনেক বেশি সুবিধাজনক।
উপসংহার
কৃষি এখন আর শুধু কায়িক শ্রমের বিষয় নয়, এটি এখন স্মার্ট ব্যবস্থাপনার নাম। আপনি যদি নার্সারি ব্যবসায়ী হন বা বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষ করেন, তবে গ্রাফটিং ক্লিপ আপনার উৎপাদন খরচ কমাতে এবং লাভের অঙ্ক বাড়াতে সরাসরি সাহায্য করবে।
সামান্য কিছু টাকার ক্লিপ আপনার হাজার হাজার টাকার চারা বাঁচিয়ে দিতে পারে। তাই সনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে আজই শুরু করুন আধুনিক গ্রাফটিং ক্লিপের ব্যবহার।
স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করুন, অধিক ফলন ঘরে তুলুন।